ক বি র দী প ক হা ল দা রে র স ঙ্গে এ কা ন্তে
জন্ম:-২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭০ -এ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার ডায়মন্ড হারবার।বাল্যকাল কেটেছে ‘বাংলা’ নামে গ্রামে।দশক হিসেবে নব্বইয়ের কবি।পেশা-শিক্ষকতা।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:-আর এক শূন্যের ভিতর(কবিতা পাক্ষিক,২০০২),দহনের বর্ণমালা (সূচীপত্র,২০০৯ ),মাধুকরী তুমি কোন পথে (পত্রলেখা,২০১২), দ্বিতীয়ার চাঁদ ও স্বস্তিক চিহ্ন (সিগনেট প্রেস,আনন্দ পাবলিশার্স২০১৭),শিরোনামহীন একা (দি সী বুক এজেন্সী২০১৮), মৃদুস্বরে যেটুকু বলা যায় (বই টার্মিনাস),পোড়া কাঠের সাজঘর প্রকাশিতব্য।পুরস্কার- সুহাসিনী রায় স্মৃতি সম্মাননা', বাংলাদেশ থেকে কবি সাযযাদ কাদির সম্মাননা ২০১৯,কবি বিনোদ বেরা স্মৃতি সম্মাননা ২০২২ প্রভৃতি।
সাতের অন্যতম কবি দীপক হালদার-এর সঙ্গে একান্ত (দূরভাষে)কথোপকথনে অনুজ কবি-প্রাবন্ধিক তাজিমুর রহমান।
(কবি দীপক হালদার।সাতের অন্যতম শক্তিশালী কবি।১৯৯০ সালে 'মগ্ন শিকড়ে একা' কাব্যগ্রন্থ দিয়ে যাঁর যাত্রা
শুরু হয়েছিল।তারপর 'নির্বাচিত কবিতা'-র হাত ধরে 'সব চলাচল পাঠঘর' হয়ে সদ্য প্রকাশিত 'বোধিসত্ত্বর আস্তানা '-য় এসে বর্তমানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কবি। আমরা আশাবাদী কবির কাছ থেকে আরও এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ উপহার পাবো।)
কবির সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতা-
১.হৃদয়লীন বেঁচে থাকাই কখনো সখনো পঙক্তিতে বাঁধা পড়ে। কিংবা এলোমেলো কিছু বাউন্ডুলেপনা হঠাৎ করেই চেনা ছক কেটে মনকে উধাও করে দেওয়ার মধ্যে যদি আপনার কবিতার বীজ লুকিয়ে থাকে তাহলে কবিতা সম্পর্কে আপনার অভিমত বলুন।
উত্তর:-আমি সবসময় কবিতার মধ্যে মগ্ন থাকি। প্রায় ২৪ ঘন্টা মগ্ন থাকি। সেখানে দেখা যায় কখনো কখনো আমার মগ্নতা থেকে কবিতা উঠে আসে। কখনো কখনো আবার চলাফেরার মধ্যে দেখা দৃশ্যপট থেকেও কবিতা উঠে আসে। একটা ঘটনার কথা বলতে পারি, আমি একটা দূরের স্কুলে চাকরি করতাম।বাসে করে যাতায়াত করতাম।নদীর ধার দিয়ে বাস যাচ্ছে।তখন একদিন দেখলাম যে, মেঘ ভেসে ভেসে নদীর দিকে বা সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে।এ দৃশ্য দেখে তখন পারিপার্শ্বিকতা সব ভুলে গেলাম। আশেপাশের সমাগমকেও ভুলে গেলাম। আমার মনে ভেসে এলো-'আকাশ এখন সমুদ্রে ঘর বাঁধতে যাবে/ আকাশ এখন সংস্কৃত/আকাশ এখন জলের ভেতর মুখ লুকাবে/ যেন বা তার আয়না মানেই জলের গূঢ় নাব্যতা ওই/আকাশ এখন পা বাড়ানোর সাধ পেয়েছে।'
এটা তো হৃদয়ে লীন ছিল না। কিংবা এমন ভাবনা তো আগে ছিল না। এটা এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তো পাওয়া।
২.আপনার ভাবনায় কবিতা কী?
উত্তর:-কবিতা হল সেই মগ্নচেতনার প্রতীক যা আমাকে এক অপার্থিব লোকে বা নতুন উপলব্ধির জগতে পৌঁছে দেবে।যেমন- রিলকে, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখের কবিতা। আসলে কবিতা তো একটা নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে না। কবিতা একটা বাড়তি বিস্তৃতির মধ্যে থাকে।সেই বিস্তৃতি একটা নতুন জায়গায় পৌঁছে দেবে বলে আমার ধারণা।সেই জায়গা থেকে আমি কবিতা পড়ি এবং সেভাবে জানার ও বোঝার চেষ্টা করছি।বলা যায় সেভাবে লেখার চেষ্টা করি।
৩. 'এক একবার' কবিতায় একবার বলেছেন, '.... এই নাও ধুলো মাটি হয় কাদা না হয় প্রতিমা বানাও', আবার বলেছেন '....রুমাল উড়িয়ে বলতে হয় ফের দেখা হবে কেন্দুলির মেলায়'-- দুটি ভাবধারা কী আপনার কবি জীবনের পাথেয়? বিষয়টি যদি একটু বুঝিয়ে বলেন।
উত্তর:-পাথেয় ঠিক নয়।ঐ কবিতাটি যখন লিখেছিলাম সেটা সম্ভবত সাতের দশকে। জনপ্রিয় হলেও কবিতাটির মধ্যে একটা ঘাটতি আছে জানি। ঘাটতি হলো, ওখানে কোথাও বলা নেই আমাকে ভাষা দাও,বা চক্ষু দান করো।অথচ শেষে বলা আছে 'দেখা হবে কেন্দুলির মেলায়'। যে মানুষটির শরীর তৈরি করা হচ্ছে,যে মানুষটি একজায়গায় বসে নিজের কাছে নিজেকে জানার চেষ্টা করছে, নিজের কাছে ফিরে আসতে হয়।সেখান থেকে তিনি শেষে বলছেন যে দেখা হবে…।
আসলে আমাদের সকলের যাত্রাপথ তো বৃহতর জগতের মধ্যে। যেহেতু কেন্দুলির মেলা একটা প্রতীক মাত্র। সেখানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে দেখেছিলাম, মানুষের মধ্যে মিলনের ঔৎসুক্য। সেই উৎসুক মানুষেরা হৃদয়ে হৃদয়ে মিলে যাবার চেষ্টা করেছিলেন।সেখানে বাউল গানের মধ্যে হোক বা অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে হোক।
৩ক) আপনি এখানে মুলত ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের মধ্যে মিলনের কথা বলেছেন।
উত্তর:-হ্যাঁ,সেটাই বলার চেষ্টা করেছি।
৪.কবিতার যাপনে অভ্যস্ত একজন কবিকে কীভাবে ও কতটা আত্মনিবেদিত হতে হয় বলে মনে করেন?
উত্তর:-আমার মনে হয় কবিকে পুরোপুরি আত্মনিবেদিত হতে হয়।কারণ,কবি যদি সেই জায়গায় না থাকেন তাহলে কবিতার প্রতি কিছুটা অসম্মান করা হয় বলে মনে করি। কিন্তু কবি তো সামাজিক মানুষ। তাঁর সংসার জীবন, সামাজিক জীবন আছে।সংসার জীবন থাকলেও কবিতার জন্য কবিকে বোধ হয় সারাক্ষণ একটা জায়গা ছেড়ে রাখতে হয়। আমি মনে হয় তোমাদের একটা কথা বলেছিলাম বা বলে থাকি, আমার অর্ধেক মানুষ কথা বলে। অর্ধেকটা মন কবিতার জন্য রেখে দিই । কারণ,ও সময় যদি কোন কবিতা আমার মধ্যে এসে যায় আমি তাকে মনে মনে নিজের মধ্যে রেখে দিই। সেজন্য আমার মনে হয়, কবিতার জন্য কবিকে সবসময় আত্মনিবেদিত হতে হয়।
৫.বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যেও যারা পুরোপুরি আত্মনিবেদিত হতে পারে না তাদের সৃষ্টির ক্ষেত্রে কি ঘাটতি থাকে? তাহলে তারা কি আত্মপ্রতারণার স্বীকার হচ্ছে?
উত্তর:-নিজের সঙ্গে প্রতারণা বলব না।তবে এক্ষেত্রে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ঘাটতি থেকে যেতে পারে। আসলে আমি যেটা ভাবি, সাহিত্যের অন্যান্য শাখার থেকে কবিতা সম্পূর্ণ আলাদা। কবিতা গল্প বা উপন্যাস নয় যে শব্দের বাহুল্য থাকবে। কবিতা থাকবে শব্দের বাঁধনে বাঁধা।অথচ তার মধ্যে একটা সম্পূর্ণতা থাকবে। উত্তরণ থাকবে। উন্নত হবার ব্যাপার থাকবে।তার নির্দিষ্ট পাখা থাকবে।সে উড়তে থাকবে আমাদের মনের মধ্যে।যারা আত্মনিবেদিত নন সেভাবে, সাংসারিক বাধা কাটিয়ে সেক্ষেত্রে ঘাটতি হতে পারে।তবে আমার মনে হয়, যারা প্রকৃত সৃষ্টিশীল তারা নিশ্চিত কবিতার জন্য একটা সময় বা অবকাশ ধরে রাখেন।
৬.আপনার কবিতা যাপনের শুরুর কথা বলুন।
উত্তর:-আমার জন্ম দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার মথুরাপুর থানার হরিণডাঙা গ্রামে।এক অজ পাড়া গাঁয়ে। কৃষি পরিবারের সন্তান। সেখানে আমাদের বাড়িতে একটা লাইব্রেরী ছিল।গ্রামীণ লাইব্রেরী। সেই লাইব্রেরির বই ফাঁকা হয়ে যেত।এলাকাবাসী বই নিতেন। যেহেতু কৃষিজীবি পরিবার আমাদের তাই চাষবাসের দিকে বেশি নজর ছিল।তবে আমাদের পড়াশোনার বিষয়ে বাবার খুব আগ্রহ ছিল।
আমার ছোটবেলার দিকে ঝোঁক ছিল ছবি আঁকার বিষয়ে। এগারো ক্লাস পর্যন্ত আমি ছবি আঁকতাম। আমার ধারনা ছিল আমি ছবি আঁকার দিকে যাব। আমার কাকা একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কাকা চেয়েছিলেন আর্ট কলেজে ভর্তি করাতে। কিন্তু আমার বাবা চেয়েছিলেন আর্ট(Art) বিষয়ে পড়ে কিছু হবে না।ফলে,ডায়মন্ড হারবার কলেজে ভর্তি করেছিলেন।থাকতাম মামার বাড়ি। মামা সরোজ দাস ছিলেন জেলা জজ।মামা গল্প, উপন্যাস, কবিতা মাঝে মাঝে লিখতেন।ওনাকে দেখে আমি লেখার উৎসাহ পাই। আমি লিখতে শুরু করি। শুরু থেকে বুঝতে পারলাম আমার লেখালেখির মাধ্যমে লোকে আমাকে জানতে পারছে।এসময় আমি সাহায্য পাই ডায়মন্ড হারবার হাইস্কুলের শিক্ষক ড.শরদিন্দু হালদারের। আমার লেখা সে সময় প্রকাশিত হত এলাকার পত্রিকাগুলোতে- দখিনা,বন্দর, ফুটপাত পত্রিকায়। উনি সেগুলো পড়ে আমাকে নানা পরামর্শ দিতেন। ভুলত্রুটিগুলো শুধরে দিতেন। ইংরেজি কবিতা পড়ার প্রতি উৎসাহ দেন।আমিও বুঝলাম যে, আমিও লিখতে পারব। এভাবেই আমার লেখার জগতে পা রাখা।
৭.গ্রাম থেকে মফস্বল-আপনার বেড়ে ওঠার এই সময়কাল কীভাবে আপনার কবিতা জীবনকে আদৃত করেছে? প্রসঙ্গত আপনার কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে পরিবারের ভুমিকা নিয়ে যদি বলেন।
উত্তর:-গ্রামে থাকলে ভালো হতো এমন বলা যায় না। আসলে আমি গ্রামের ছেলে হিসেবে মাঠে যেতাম গরু নিয়ে। বাড়িতে চাষবাসও ছিল। ঐ সময় গ্রাম নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। সেই সিরিজের একটা কবিতা তৎকালীন যুগান্তর পত্রিকাগোষ্ঠীর 'অমৃত' নামে('দেশ' পত্রিকার মতো) একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে সত্তর দশকের কবিতা নামে একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেখানে আমার কবিতা জায়গা পেয়েছে।এটা দেখে আমার উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। এমনকি সে সংখ্যায় শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষের নিয়ে কিছু লেখা ও ছোট ছোট কবিতা বের হয়।যা আমাকে ভীষণ উৎসাহিত করেছিল।
সত্তরের কবি হিসেবে তখন চিহ্নিত করে দেওয়ার জন্য আমি গ্রাম ছেড়ে শহরের কবিতার জীবনে এগিয়ে যেতে থাকলাম।আসলে গ্রামে তো তেমন সাহিত্যের পরিবেশ ছিল না। এখানে এসে বৃহৎত্তর জগতে আরো বেশি বই পড়ার সুযোগ পাই।আর এক্ষেত্রে আমাকে সবথেকে বেশী সাহায্য করেছিলেন আমার সাহিত্যগুরু কবি বাসুদেব দেব।
৮.প্রশ্ন:-পারিবারিক সাহায্য কতটা পেয়েছিলেন?
উত্তর:-এক্ষেত্রে পারিবারিক ভুমিকা তেমন ছিল না বলা যায়। বরং আমি রাতজেগে সাহিত্য করি বা কবিতা লিখি তা বাড়ির লোক সমর্থন করেনি। তাদের চোখে একাজে আমার পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে হত।ঐসময় আমি 'দখিনা' পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছিলাম।সেটা মামা দেখেছিলেন।মামা বাবাকে বলায় বাবা আপত্তি করেছিলেন লেখালেখিতে। কিন্তু মামা বাবাকে বুঝিয়ে বলেছিলেন।তাই বলা যায়, পারিবারিক উৎসাহ ছিল না।
এরপর, যে স্কুলে চাকরি করতাম,সেসময় শিক্ষকদের মাহিনা যা ছিল তা শিক্ষকদের না দিয়ে সেই টাকা নিয়ে স্কুলের উন্নয়নে কাজে লাগানো হত।ফলে আমার শুধু গাড়িভাড়ার টাকাটা হয়তো থাকত।তাই বই পত্র কেনার কোন পয়সা ছিল না।সব থেকে বড় কথা আমার কোন বাংলা অভিধান ছিল না। আমি ফুটপাত থেকে একটা পকেট অভিধান কিনেছিলাম।যা জলে ভেজা।পরে সেটা শুকিয়ে সেরে-সুরে নিয়েছিলাম। এসময় আমার দাদা ইউকো ব্যাংকে চাকরি পায়। দাদাকে বলায় দাদা আমাকে এ. টি. দেবের একটা অভিধান কিনে দিয়েছিলেন।ওটাই আমার কবিতা লেখার জীবনে নানা ভাবে সাহায্য করে।তবে, পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ থাকায় লেখালেখির ক্ষেত্রে খুব অসুবিধা হয় নি।
৯.কবিতা যাপনের একটা সময়ে আপনি পেয়েছেন কবি বাসুদেব দেবের মতো কবিকে।সেদিক থেকে দেখলে তিনি আপনার কবিতাগুরু। তাঁর কথা আপনি নানা সময়ে বলেন এবং কবিতা চর্চায় আপনি তাঁর ঋণের কথা স্বীকারও করেছেন। বিষয়টি একটু বলবেন?
উত্তর:- কবি বাসুদেব দেবের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয় অদ্ভুতভাবে। তখন ডায়মন্ড হারবারের 'দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদ'এর আমি সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলাম। একদিন ওই সংগঠনের প্রধান সাংবাদিক অনল মন্ডল আমাকে বললেন যে, নেহেরু যুব কেন্দ্রের দায়িত্বে (অধিকর্তা) এসেছেন কবি বাসুদেব দেব।চলো, ওনার কাছে যাই ডায়মন্ড হারবারে একটা কবিসম্মেলন করার জন্য।প্রস্তাব শুনে বাসুদেবদা এককথায় রাজি। তবে,জায়গাটি পরিবর্তন হয়ে হয়ে গেল জয়নগরের 'রূপ-অরূপ' মঞ্চ। তিনি কবিদের আনা ও যাবতীয় খরচের দায়িত্বও নিলেন।
এরপর অনলদা কাজ থাকায় চলে যাবার কথা বলায় বাসুদেবদা আমার কাজ না থাকলে থেকে যেতে বললেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি করা হয়? শিক্ষকতা করার কথা বলায়, তিনি বললেন সাহিত্যের কি করা হয়। টুকটাক লেখালেখি করি বলায় উনি ওই সময়ের দশজন কবির নাম জানতে চাইলেন।আমিও বললাম।সেই তালিকায় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- এর নাম ছিল না। উনি আমাকে তাঁর কবিতা পড়েছি কিনা জানতে চাইলেন। আমি পড়েছি জানালাম।তার বই আমার কাছে আছেও জানালাম।এ অবস্থায় নিজের ভুল স্বীকারও করে নিলাম।
এরপর তিনি আমার কবিতার ডায়রি নিয়ে সন্ধ্যায় তাঁর কাছে যেতে বললেন।এক রবিবার সন্ধ্যায় তাঁর কাছে গেলাম। আমি লিখতাম নবলিপি, বঙ্গলিপি খাতায়।কারণ,তখন ডায়রি কেনার পয়সা ছিল না। উনি খাতা থেকে একটা কবিতা বেছে নিয়ে বললেন একটা ভালো সুভ্যেনির বের হবে ঐসময়ের বিশিষ্ট কবিদের কবিতা নিয়ে। সেখানে ও তোমার কবিতা থাকবে।এরপর তিনি বাড়ির ভেতরে গিয়ে একটা ডায়রি নিয়ে, 'প্রিয় দীপককে কবিতা লেখার জন্য' লিখে আমাকে উপহার দিলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।আর প্রতিদিন আমাকে ঐ ডায়রিতে কবিতা লেখার পরামর্শ দিলেন।
এরপর উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি কি বই পড়েছো?বিদেশী কবিতা কী পড়েছো?
কিন্তু আমার তো তখন ভাড়ার শূন্য। এরপর, তিনি ওনার বুকসেল্ফের কাছে নিয়ে গেলেন।অবাক হয়ে দেখলাম, সেখানে লেখা আছে-'এরা বেড়াতে ভালো বাসে না।এরা ভ্রমণবিলাসী নয়।'তখন উনি আমাকে কয়েকটা বই পড়তে দিলেন। সেগুলো হলো, বোদলেয়ারের কবিতা,রিলকের কবিতা, হেল্ডরলিনের কবিতার বই।
আমি আশ্চর্যজনকভাবে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে রিলকের কবিতার ভুমিকা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বোদলেয়ারের কবিতা পড়লাম। কিন্তু রিলকের কবিতার গভীরতা, মগ্নতা, বিভোরতা, আত্মনিবেদনের রূপ আমার বেশি ভালো লাগলো।
এর বেশকয়েকদিন পর বইগুলো নিয়ে তাঁর কাছে ফেরত দিতে গেলাম। তিনি বললেন,আমার বইগুলো আমার আত্মীয়ের কাছে বেড়াতে গেছিল।তবে, আমার মনে হয় না যে, তাদের অযত্ন হয়েছে।তাই আমি তোমাকে পরীক্ষা করব।বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন। আমি যথাসম্ভব উত্তর দিলাম। উনি খুশি হলেন।
তারপর,আমরা যে তিনজন(কবি সুব্রত ভুঁইয়া, বলরাম বাহাদুর ও আমি) ডায়মন্ড হারবারে ছিলাম এবং 'অর্কেষ্টা' বলে পত্রিকা করতাম, সকলে একদিন বাসুদেবদার কাছে গেলাম। উনি পত্রিকাটা দেখে রেগুলার প্রকাশিত হয় কিনা জানতে চাইলে আমাদের সমস্যার কথা বলে পত্রিকা আর বের হবে না তা জানালাম।
এরপর তিনি আমাদের প্রতি রবিবার তাঁর ওখানে যাবার আমন্ত্রণ জানান।তবে শর্ত হল,সাতদিনে সাতটি করে কবিতা লিখে আনতে হবে।
আর বললেন, ভালো লাগলে চা,বিস্কুট, মিস্টি পাবে।না ভালো লাগলে চড়-চাপড় পাবে।
আমরা ভয় নিয়ে ফিরে এলাম। এভাবে রবিবার করে কবিতা পড়া চলছে।এরপর এক রবিবার আমরা গেলাম।সবাই কবিতা পড়ল। আমিও পড়লাম। তিনি হঠাৎ আমাকে ডাকলেন। বললেন দীপক, একবার উঠে এসো তো। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম।এই লোকজনের সামনে আমায় মারবে? ভয়ে ভয়ে তাঁর কাছে গেলাম।তিনি আমার হাতদুটো জড়িয়ে ধরলেন।বললেন,দীপক আমার সোনা, হীরে, মানিক নেই।নেই কোন রত্ন। আমি রত্ন বিশারদও নই। কিন্তু তুমি আজকের যে কবিতা লিখেছো তা চিরন্তন কালের কবিতা। আমি মুগ্ধ।বলে,আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।এ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার (অশ্রূসিক্ত গলায়) ভাই।যেটা অরুণ আমার সম্পর্কে 'নৌবত' ওয়েবজিনে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছে -কবিতার নাম 'মুখ'।কবিতাটি—
"তিনি দেশলাই-এ কাঠিটা ঘষে বললেন
এভাবে চললে অচিরেই তাঁর মুখ দেখা যাবে
ফস্ করে আলোটা জ্বলার সাথে সাথে
তাঁর মুখ দেখার জন্য তাকাতেই কাঠিটা নিভে গেল
গলা উঁচু করে ফের তিনি বললেন
আজ বড়ো অন্ধকার
অন্ধকারে আরও বহু মুখ আছে"
(মুখ)
এরপর আশ্চর্যজনক ভাবে আমার পরিচয় হয় কবি বীতশোক ভট্টাচার্যের সঙ্গে। উনি পন্ডিত, বিদগ্ধ, অধ্যাপক মানুষ।ঐ সময় মেদিনীপুরের কয়েকটি পত্রিকায় আমার কবিতা পড়ে উনি আমাকে চিঠি দিয়ে তাঁর ভালো লাগার কথা বলে এভাবে আমাকে লিখে যেতে উৎসাহিত করেন।ওই সময় আসামের একটি কাগজে আমি লিখতাম (কবি উর্ধেন্দু দাশের 'মজলিশ')। সেখানে একটি প্রবন্ধ উনি লিখেছিলেন।সম্ভবত 'এই সময়ের কবিতা' শিরোনামে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন,দীপক হালদারের 'মুখ' কবিতা যদি চিরকালের কোন কবিতা সংকলন হয়, সেখানে অবশ্যই স্থান পাবার যোগ্য।পরে, এবিষয়ে আমি বীতশোক ভট্টাচার্যের কাছে চিঠি দিয়েছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, আমি যা বলেছি একদম ঠিক।বাসুদেবদাকে প্রবন্ধটি দেখাই। তিনিও সহমত পোষণ করেছিলেন।এভাবেই ভাই, আমার কবিতা জীবন এগিয়েছে। আমি উৎসাহিত হয়েছি। এছাড়াও সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি সুধীর দত্ত,কবি অমিতাভ মৈত্র-র সান্নিধ্য আমাকে নানা ভাবে উৎসাহিত করেছে।
৯.প্রসঙ্গত বলতে ইচ্ছে করছে যে সবকবির ক্ষেত্রে তাঁর কবিতা যাপনের শুরুতে এমন কাউকে 'কবিতাগুরু' হিসেবে পাওয়া কী তাঁর কবিজীবনকে সমৃদ্ধ করে বলে মনে করেন? যদি হয় কীভাবে?
উত্তর:-আমি সেটা ঠিক মনে করি না।কারণ, এটা হয়তো কিছুটা এগিয়ে দেয়। এপ্রসঙ্গে জয় গোস্বামীর কথা বলা যায়।জয় তো নদীয়ায় বসে নিজে নিজে চর্চা করত।পরে পেয়েছেন দেবদাস আচার্য্য বা অন্যান্যদের ।পরে শ্যামল(কবি শ্যামল কান্তি দাশ) ওখানে গিয়েছে। সেগুলো ঠিক আছে। কিন্তু কবিতা চর্চাটা বা সাধনাটা নিজে থেকে করতে হয়। নিজেকে মগ্ন বা বিভোর থাকতে হয়। সেই মগ্নতা বা বিভোরতা থেকে যে শব্দ বা বোধ আসে তা থেকে কবিতার জন্ম হয় বলে আমার বিশ্বাস। সেখানে সবসময় বাসুদেবদা বা কাউকে পাওয়া যাবে তাই মনে হয়না। এপ্রসঙ্গে একটা কথা বলি,কবি সামসুল হক 'ষাটের দশক' বলে একটা পত্রিকা প্রকাশ করতেন। সেখানে শুধু ষাটের কবিদের কবিতা থাকত। হঠাৎ একদিন সামসুলদা আমাকে চিঠি পাঠালেন যে,স্নেহ স্বভাবতঃই নিন্মগামী। ষাটের দশক শুধুমাত্র ঐ দশকের কবিদের জন্য নির্দিষ্ট। কিন্তু আমার মনে হয় তুমি এই ষাটের দশকের একদম শেষে থাকার মতো একজন কবি।যার কবিতা এই ষাটের দশকে প্রকাশিত হতে পারে। তুমি এই চিঠি পাবার পরে একটি কবিতা পাঠিয়ে দাও। এটাও আমার কাছে একটা বড় প্রাপ্তি ভাই।
১০.৭০ দশকে অনেকেই সময়ের উত্তাল রূপকে সরাসরি কবিতায় আনলেন। অথচ আপনার কবিতা হয়ে উঠল মৃদু উচ্চারণের। মগ্নতা ছোঁয়া জীবনবোধের প্রতীক।আপনি সমসাময়িক সময়ের উত্তাপ থেকে কীভাবে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আত্মমগ্নতার ডুব দিতে শিখলেন ?
উত্তর:-আমার মনে হয় কবিকে সময়ের মধ্যে ডুব দিতে হয়।সেই সময় যে উত্তাল সময়,নাম করে বলি নকশাল পিরিয়ড,সে সময়ে আমি যে কিছু উত্তাপ পাইনি তাই নয়।সে সময় আমি ডিগ্রী কোর্সের পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় একটা কাজে যুক্ত হয়েছিলাম। কাজটা হল, 'এপার বাংলা ওপার বাংলা মৈত্রী পরিষদ' একটা পত্রিকা প্রকাশ করতেন 'এপার বাংলা ওপার বাংলা' নামে। সেখানে অধ্যাপক ড.দুলাল চৌধুরী, বি টি কলেজের অধ্যাপক দীনেশ বাবু, সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ও মনোজ বসু যুক্ত ছিলেন।ড. দুলাল চৌধুরী আমাকে ওখানে নিয়ে যান। বেলেঘাটায় ওদের অফিস ছিল।সেই অফিসের একমাত্র কর্মচারী আমি।ওখানে পূর্ব পাকিস্তানের মুজিবুর রহমানের সমর্থনে যেসকল পত্রিকায় লেখালেখি থাকত সেগুলো আসত। আমার কাজ ছিল ওদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া পত্রিকাগুলোর লেখা কপি করে একটা প্রেসে গোপনে পৌঁছে দেওয়া। বিদেশি রাষ্ট্রের বিষয়,তাই পত্রিকা সরাসরি নিয়ে যাওয়া যেত না। বেলেঘাটা ছিল নকশালদের বড় ঘাঁটি। কিন্তু যেদিন আমি বেলেঘাটা গেছি, এবং অফিসে বসেছি, কিছুক্ষণ পরে দেখলাম বোমাবাজি, গোলাগুলির শব্দ । আমি একটু মুখ বাড়িয়ে বাইরে রাস্তার দিকে দেখলাম দুটি বডি পড়ে আছে। আমি দুলালবাবুকে ফোন করলাম এবং বিষয়টি জানালাম। তিনি অভয় দিয়ে আমাকে গাড়ি না পেলে শিয়ালদহ হেঁটে চলে যেতে বললেন।এরপর আর একদিন আমি সব লেখা কপি করতে না পারায় কিছু পত্রিকা ব্যাগে করে নিয়ে বাড়ি আসছিলাম। সে সময় সাদা পোষাকের পুলিশ আমাকে ফলো করায় ড.চৌধুরী বুঝতে পেরে ঘুরপথে আমাকে নিয়ে শিয়ালদহ থেকে যাদবপুরে চলে এসেছিলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওটা। তবে আমার মনে হয়েছিল যেহেতু আমি সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নই( তবে আমাদের অনেক কৃতি ছাত্র ও বন্ধুরা যুক্ত হয়েছিলেন।) তাই সে সব বিষয় নিয়ে লিখতে চাইনি।আমি আমার নিজস্ব জায়গায় বিভোর থেকে লেখালেখি করেছি।
১১.'বাউল' কবিতায় বলেছেন 'ওষ্ঠ এবং জলের গ্লাসের মাঝে / ভালোবাসার দুখানি পা বাউল হয়ে আছে '
আবার 'ঈশ্বর' কবিতায় বলেছেন - 'মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ালে মানুষ ঈশ্বর হয়ে ওঠে' কোনটাকে আপনার ডেস্টিনেসন ভাববো?
উত্তর:-কবির ডেস্টিনেশন কি একটা হয়?কবির ডেস্টিনেশন হল মানুষ এবং বৃহত্তর জগৎ।যদি সমুদ্র বলতে চাও, আকাশ বলতে চাও, তাই।'ওষ্ঠ এবং জলের গ্লাসের মাঝে/ভালোবাসার দুখানি পা বাউল হয়ে আছে–আমি এই কবিতাটি লেখার পরে এতটা নিজে নিজেই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে বোঝাতে পারবো না।ওই সময় বইমেলা চলাকালীন 'মহাদিগন্ত' পত্রিকার একটা ফোল্ডার বেরিয়েছিল। কারোর কবিতা প্রকাশিত হবার পর স্টলে অনেক সময় অনেকের কবিতা চিৎকার করে পড়া হয়। আমার এই কবিতাটি পড়া হচ্ছিল। ডায়মন্ড হারবারের মিহির মন্ডল সেটা শুনে বাড়ি ফিরে পরের দিন সকালে আমার বাসাতে আসেন। আমার কাছে জানতে চান যে, দীপক এই কবিতাটি কী তোমার? আমি বললাম হ্যাঁ।বলেন যে,বইমেলায় এটি নিয়ে চেঁচামেচি হচ্ছে।বলে, চলো আমরা বই মেলায় যাই।পরেরদিন যথারীতি আমরা বইমেলা যাই এবং সেখানে গিয়ে আমি ওটা পড়ি।
পরে ডায়মন্ড হারবার এসেছিলেন কবি সামসুল হক, অমিতাভ দাশগুপ্ত এবং বাসুদেবদা। ওদের সঙ্গে আমি ডায়মন্ড হারবার নদীর ধার দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। যেতে যেতে হঠাৎ সামসুলদা বললেন,জানো বাসু, দীপক তো জ্যান্ত ভাবে বেঁচে আছে। আমি বললাম,জ্যান্তভাবে বেঁচে আছে বলতে? বাসুদা বলছেন, কেন? সামসুলদা বললেন, জানো,ও কী লিখেছে-'ওষ্ঠ এবং জলের গ্লাসের মাঝে/ভালোবাসার দুখানি পা বাউল হয়ে আছে '
আমরা কেউ এটা লিখতে পেরেছি! বাসুদেবদা বললেন, হ্যাঁ,সত্যি ও তো মুগ্ধ করে দিয়েছে আমাদের।এই সব উৎসাহ ও ভালবাসা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে ও নতুন একটা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।আর 'ঈশ্বর' কবিতাটি বলি।তখন বোধ হয় বামফ্রন্টের সময়।তখন তো কিছু কিছু অত্যাচার হয়েছিল। মেদিনীপুরের একটা বৃদ্ধার বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল জোরজবরদস্তি করে।সেই বৃদ্ধার কেউ ছিল না। পরে বামফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ বিষয়টি অন্যায় হয়েছে বুঝতে পেরে দলবল নিয়ে ঐ বৃদ্ধার বাড়িটি নতুনভাবে বেঁধে দিয়েছিল।এই ঘটনাটি আমাকে নাড়ায়। তখনই আমার 'ঈশ্বর' কবিতাটি লেখা। তাই বলেছিলাম
'মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ালে মানুষ ঈশ্বর হয়ে ওঠে'।
১২.আপনি চিরকাল ভালবাসাকে (বানভাসি কবিতা সহ অন্যান্য)পাথেয় করেছেন।যা আবর্তিত হয়েছে ঈশ্বর, পৃথিবী ও প্রিয়জনকে কেন্দ্র করে।এ চাওয়া তো এ বিশ্বের সিংহভাগ মানুষের।কবি দীপক হালদার ভালবাসাকে কীভাবে দেখতে চেয়েছেন?
উত্তর:-কবি দীপক হালদার ভালবাসাকে একটি সর্বজনীন মানবিক রূপে দেখতে চায়।কারণ, আমার চোখে পড়েছে অনেক কবি, অনেক মানুষ ভালবাসার জন্য অনাথ হয়ে গেছে।অনাথ হয়ে গেছে এই অর্থে, তাদের জীবনটা খুব বক্রপথে এগিয়েছে। মানুষ যদি ঠিক মতো ভালবাসা পায় তাহলে তার জীবনটা উন্নত করতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু ভালবাসা না হবার জন্য অনেক ক্ষতি হয়।ক্ষতি এই অর্থে যে,সে জীবনটাকে ঠিক মতো চালনা করতে পারে না। আমি সেই ভাবেই দেখি। এবং আমার কবিতায় সেটাই ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সবটা হয়তো পারিনি….
১৩.'....একপায়ে বক জোড় ও আলাপে' -এটাই কি আপনার কবিতার মুল ফ্লেবার? যদি তাই হয় তাহলে 'নির্বাচিত কবিতা'র অগ্রন্থিত কবিতাগুলোতে সেই ভাবনা থেকে এতটা দূরে সরে আসাটা কী সময়ের বিবর্তনের স্বত:স্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ না সচেতন ভাবে সরে আসা?
উত্তর:-এখানে দুটি ভাগ আছে ভাই। আমি যখন নির্বাচিত কবিতা করি,তখন যে বিভাজনটা করেছিলাম,আর যে অগ্রন্থিত কবিতা সেখানে একটা বিভাজনও আছে। সেখানে দেখবে যে, পিঁপড়ে …,যে কবিতার শেষের লাইন তুমি তুলেছো–ঐ কবিতাগুলি তিন দিনে সারা রাত জেগে একটা ঘোরের মধ্যে লেখা।মোট ৯৭টি কবিতা। ওগুলো একটা আলাদা বই হতে পারত। কিন্তু আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় করা সম্ভব হয়নি।
আর একটা কথা বলা দরকার,ওই সময় মেদিনীপুর থেকে কবি সোফিওর রহমান আমার কাছে এসেছিলেন।সম্ভবতঃ 'কবিতা সীমান্ত' নামে একটি পত্রিকা করত।তা উনি সামসুলদার কাছে গেছিলেন এবং জানতে চেয়েছিলেন যে,৭০-এর কোন কবির সাক্ষাৎকার নিতে চাইলে কার সাক্ষাৎকার নেওয়া যায়?সামসুলদা তাঁকে আমার কথা বলেন।তাই সেদিন রাতে সোফিওর আমার কাছে ছিলেন এবং নানা প্রশ্ন করেছিলেন। সেদিন সারারাত আমি জেগে কবিতাগুলি লিখেছিলাম। ফলে একটা ঘোরের মধ্যে লেখা ওই পর্বের কবিতাগুলো একটি ধারা বহন করে।আর বাকিগুলো অন্য এক ধারা বহন করেছে।আসলে, সারাদিন কর্মজগতে ব্যস্ততার মধ্যেও আমার কবিতার জগতে বিচরণ চলে। ফলে, সারাদিনের অভিজ্ঞতা,দেখা দৃশ্য প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে অনুভূতিগুলো কবিতায় জেগে ওঠে।
১৪.'ঘ্রাণে জাগে বয়ার আলোটি' নামে সিরিজ কবিতায় কবি দীপক হালদার নানা ভাবে নিজেকে ভেঙেছেন-গড়েছেন। কিন্তু একেবারে শেষ অংশে (৪৫) গিয়ে সমুহকে পান করে নতুন মূর্তি বানিয়ে চক্ষুদান ক্রিয়া সারতে চেয়েছেন। এটা কি শুধু মূর্তির চক্ষুদান না কবির নিজেরও –একটু যদি বলেন।
উত্তর:-আসলে একটা কবিতা লেখার পরে সেটা আর কবির থাকেনা।যদি ওই কবিতাটি যদি ঐ চক্ষুদান বিষয়টি সামগ্রিকতায় পৌঁছে যায় বা কোন মানুষকে নতুন উপলব্ধির জায়গায় পৌঁছে দেয়। সেটা সার্থকতা। আমি সেই জায়গাটি ধরার চেষ্টা করেছি।-বলি জাগাও……
১৫.আপনার কবিতায়-সে ও তিনি--সর্বনাম দুটি বার বার এসেছে।এ বিষয়ে যদি একটু বলেন।
উত্তর:-সে, তুমি– বিষয়টি নিয়ে পরে আসছি।এর আগেও এ প্রশ্ন আর একজন করেছিলেন আমাকে। এবিষয়ে অতীতের একটি ঘটনা বলি –আমরা তখন বাসুদেবদার কাছে কবিতা পড়তাম।সে সময় বৌদি চা দিতে আসতেন মাঝে মাঝে। সেখানে একটি কবিতায় 'সে' শুনে বৌদি জানতে চেয়েছিলেন যে, দীপকের কবিতায় 'সে' কি তার প্রেমিকা না বউ? তার উত্তরে বাসুদেবদা বলেছিলেন, দীপকের তো বিয়ে হয়নি। অতএব তার বউ নয়। প্রেমিকা কিনা জানিনা।তাছাড়া,সে সবসময় প্রেমিকা বা বউ হতে হবে এমন তো নয়। অন্য কিছু হতে পারে,ঈশ্বর তো হতে পারে। ঈশ্বর তো আমাদের প্রাণের মানুষ। তাঁকে যদি সে বলে সম্বোধন করা যায় তাহলে সে ও তো আমাদের কাছে থাকে।দীপক হয়তো সেভাবে বলতে চেয়েছে। আমি,সে, তুমি-আমি এভাবে বলতে চেয়েছি তাই।
১৬.আপনার দশকের দুই কবি জয় গোস্বামী ও সুবোধ সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর:-আমার মূল্যায়ন জয় গোস্বামীর ব্যাপ্তি অনেক বেশি।এর কারনটা হল এই,জয়ের কবিতা শুধু নয়,তাঁর গদ্য,প্রবন্ধ, উপন্যাস -আমাকে অনেক বেশি ঋদ্ধ করেছে।আর সুবোধ সরকারের কবিতা বা গদ্য যেহেতু আমার বেশি পড়া নেই।তাই, তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করা আমার উচিত হবে না। তাসত্ত্বেও যেটুকু পড়েছি তাতে মনে হয়েছে তাঁর কবিতায় সমাজ ও সামাজিক অবক্ষয়ের ছবি মাঝে মাঝে দেখা যায।
(কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে সুবোধ সরকারের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, সুবোধের কিছু কবিতা ভাল লাগে। বাকি কবিতাকে কবিতা হিসেবে ধরতে চাননি।সে জায়গায় আপনার সঙ্গে পবিত্রদার মূল্যায়নের অনেকটা সাদৃশ্য রয়েছে।)
১৭.পরবর্তীকালে শ্রীজাত,বিনায়ক, অংশুমান --যারা বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ কান্ডারী বলে ইঙ্গিতে ঘোষিত। এবিষয়ে আপনার মতামত।
উত্তর:-আমার কাছে অংশুমান অনেক বড় কবি বলে মনে হয়। কিন্তু মাঝে ওকে নিয়ে কী সব গন্ডগোল হল।যাই হোক, ওকে তুলনায় ওদের মধ্যে বড় কবি বলে মনে হয়। শ্রীজাতর লেখাও ভালো।আর বিনায়কের লেখাও ভালো। হয়তো সে কম লেখেন বলে আমার কাছে তেমন আসেনি। তবে ওর লেখাও ভালো।
১৮.কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় শ্রীজাতকে কবি হিসেবে গ্রাহ্য করেননি? আপনার মত কী?
উত্তর:-আসলে হয়টা কী, আমরা যখন প্রচারের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠি,তখন আমরা নিজেদের ধরে রাখতে পারি না।কী লেখা উচিত,আর কী উচিত নয়, কোনটি পাঠকদের সামনে দেওয়া উচিত! পাঠক কিন্তু সর্বজ্ঞ ভাই। কিছু কিছু পাঠক আছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় নত হতে হয়।তারা কীভাবে কবিতাকে বোঝেন? এমন পাঠক আছেন তারা কবিতাকে খুব ভালো বোঝেন?
১৯.আমি জানতে চাইছি শ্রীজাত-র কবিসত্তা নিয়ে আপনি কি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন?
উত্তর:-পবিত্রদা কোলকাতায় থাকেন। তিনি অনেক বেশি পড়াশোনা করেন। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, শ্রীজাত -বিনায়কের মধ্যে বিনায়ক অনেক বড় কবি।তবে এদের মধ্যে অংশুমানকে আমার খুব ভালো কবি বলে মনে হয়। কিন্তু ইদানিং তার লেখা তেমন হচ্ছে না। হয়তো কোন মানসিক চাপের জন্য তা হচ্ছে না।তা হলেও বলব,ও এদের মধ্যে প্রথম দিকে থাকবেন।
২০.শহরের ফোকাস থেকে দূরে ডায়মন্ড হারবারে বসে কবিতা চর্চার জন্য কী আপনার কবি জীবনের যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি বলে কখনো মনে হয়েছে?
উত্তর:-আমি মূল্যায়নে যাচ্ছি না।তবে আমার কবিতা চর্চার কোন বিঘ্ন ঘটেনি। আমি যখন এখানে বসে (এটা কিছু মনে করো না ভাই) তখন আমার কবিতা শারদ সংখ্যা 'এক্ষন'-এ বার বার প্রকাশিত হয়,তখন বুঝতে পারি আমার কবিতা একটা জায়গা করে নিতে পেরেছে। আমার কখনো 'এক্ষন'-এ যাবার সুযোগ হয়নি। আমার ভাইকে পাঠাতাম। পত্রিকা প্রকাশ পেলে ও হাওড়ার অফিস থেকে ফেরার পথে পত্রিকা নিয়ে আসত। সেখানে কবি অন্নদাশঙ্কর রায়,দায়ুদ হায়দার ও নির্মাল্য আচার্য্য ছিলেন।তো সেখানে একদিন নির্মাল্য আচার্য্য আমার ভাইকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, দীপক হালদার কে হয়?ও কোলকাতা আসে না?
–ভাই বলেছিল যে, আমার দাদা।
-না,ও কোলকাতা আসে না। আমাকে লেখা খামে করে দিয়ে শিয়ালদহ পোস্ট অফিসে ফেলে দিতে বলে।ওকে তো কোলকাতা আসতে দেখি না। হয়তো ও কোলকাতা আসতে ভালো বাসে না।
–কিন্তু, আমরা ওর মুখটা একবার দেখতে চাই।ও এত ভালো লেখে,ও কেন আসে না?
আর একটা ঘটনা বলি-তখন 'প্রতিক্ষণ' বলে একটা পত্রিকা প্রকাশ হত। ওখানে কবি অরুন মিত্র কবিতা দেখতেন।ওই পত্রিকায় একটি কবিতা ছাপা হবার পর আমাকে চিঠি দিয়েছিলেন,যে তুমি কবিতা পাঠাবে এখানে।আর,এর আগের একটি ঘটনা, 'ধ্রূপদী' বলে একটা পত্রিকা বের হত। সম্ভবতঃ যাদবপুর বা ওই এলাকা থেকে। সুশীল রায় সম্পাদনা করতেন। ওখানে লেখার সূত্রে দেখা হয়েছিল কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর সঙ্গে।যদিও এর আগে তাঁর সঙ্গে ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ,জয়নগর কবিতা অনুষ্ঠানে আলাপ হয়েছিল।তা বীরেনদা ছোট ছোট পাতলা কবিতার বই করতেন। সেগুলো আমাদের দিতেন আর বলতেন বিক্রি করে টাকা দিও ভাই।কারণ,ওই টাকায় আমার খাবার পাই ।
কীরকম কৃচ্ছ সাধন করে থাকতেন তিনি, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।ভাবলে বড় কষ্ট হয়।সে সব দেখে মনে হয়েছিল, একজন এরকম অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এরকম অবস্থায় তো কবিতার সাধনা করেছেন। সেখানে তো তাঁর কবিতা চর্চায় কোন ঘাটতি হচ্ছে না বা কোন অভাব বোধ নেই।
ও সময়ের আর একটি ঘটনা বলি, আকাশবাণীতে ওঁকে ও কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে কবিতা পড়তে ডাকা হয়েছিল। সেখানে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে যে টাকা দেওয়া হয়েছিল, বীরেনদাকে সে টাকা দেওয়া হয়নি।বীরেনদা প্রতিবাদ করে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং বলেছিলেন,কবির ক্ষেত্রে এটা কখনো ঠিক নয়। আমরা যখন একসাথে কবিতা পড়েছি তাহলে আমাদের সমান দক্ষিনা দেওয়া উচিত।এই ঘটনাও আমাকে খুব উদ্দীপিত করেছিল ও সম্মানিত করেছিল।
তাই,মফস্বলে থেকে কবিতা চর্চা করার জন্য আমার কোন আক্ষেপ নেই।তবে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে হয়তো শহরে থাকলে আর একটু আলোকিত হতে পারতাম।আবার কখনো কখনো মনে হয়েছে, শহরে থাকলে এভাবে কী মগ্নতার মধ্যে থাকতে পারতাম, না কি প্রচারের আলোয় হারিয়ে যেতাম!
২১. পুরস্কার একজন কবির জীবন কতটা আলোকিত করে বলে আপনার মনে হয়?
উত্তর: পুরস্কার আলোকিত করে কিনা জানিনা। তবে উৎসাহিত করে।এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা বলি, আমাকে একবার শিলিগুড়ি থেকে একটা কবিতার জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছিল।সেই পুরস্কারের বিষয়টি টিভিতে টেলিকাস্ট হয়। বাড়িতে ফিরে দেখি কবি বাসুদেব দেবের একটা চিঠি।সেই চিঠিতে তিনি যা বলেছিলেন তার মুল কথা হল,দীপক জীবনে পুরস্কার সব নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা হল বড়ো কথা। তুমি যেভাবে লিখে চলেছো,এগিয়ে চলো। পুরস্কার তোমাকে আদৃত করতে পারে, সম্মানিত করতে পারে। এগিয়ে দিতে পারে না।এই 'এগিয়ে দিতে পারবে না' কথাটা আমার কাছে বড় বিষয় বলে মনে হয়। তাহলে এগোনোটা কি কবির নিজস্ব ব্যাপার? আমি তখন বিষয়টি নিয়ে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম বাসুদাকে।বাসুদা বলেছিলেন,একদম নিজস্ব ব্যাপার। কবি এগিয়ে যাবেন নিজস্ব ক্ষমতায়, নিজস্ব মনের জোরে।পুরস্কার, সে দরকার হলে আসবে,না হলে আসবে না। রবীন্দ্রনাথকে কি নোবেল কমিটির কাছে গীতাঞ্জলির জন্য বলতে হয়েছিল যে,পুরস্কার দাও?বলতে তো হয়নি।
২২.বর্তমানে বিভিন্ন ভাবে শোনা যায় যে, পুরস্কারের মধ্যে একটা সিন্ডিকেটের ছোঁয়া কিংবা অনেকটা Give and Take Policy অর্থাৎ তুমি আমায় দাও, আমি তোমায় দেবো '!এ বিষয়ে আপনার মতামত?
উত্তর:- এটা অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি।দেখেছি মানে,
যা প্রকাশ পেয়েছে।তবে, এরকম বিষয় থেকে অনেক দূরে আছি, তাই ওসব নিয়ে ভাবি না। ভাবতেও চাই না।
২৩.সামাজিক মাধ্যমে কবিতা চর্চাকারীরা, বিশেষ করে তরুন সম্প্রদায়,তাদের অনেকেই নিজেদের শক্তিশালী কবি বলে জোর গলায় দাবি করে থাকেন। এ সম্পর্কে আপনার সংক্ষিপ্ত মতামত পেলে ভালো লাগবে।
উত্তর:- আমার মনে হয়েছে প্রিন্ট মিডিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী।কারণ,এর একটি স্থায়িত্ব আছে।এটি অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, এবং বিচারের জায়গাটা করার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু এই যে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সরাসরি বললে ফেসবুকের কথা বলা যায়,এগুলোর অনেকেই দেখলেও বা মন্তব্য করলেও কজন ভেবে চিন্তে মন্তব্য করছেন বা লেখার প্রকৃত বিচার করছেন সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। কিংবা প্রকৃত কজন গুণীজন বা সমালোচক এ বিষয়ে বলতে পারছেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
আর, সামাজিক মাধ্যমে যারা নিজেদের কবি হিসেবে তুলে ধরছেন, কিংবা তাদের কবিতা নিজেরাই তুলে ধরছেন,সেক্ষেত্রে তাদের কবিতা কতখানি চিরকালীন রসদ নিয়ে হাজির হচ্ছে তার বিচার হচ্ছে না।সেই বিচার হওয়া দরকার প্রত্যেক কবির ক্ষেত্রে।এই রসদটা কবিতায় বা যে কোন সাহিত্যের ক্ষেত্রে থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে এই নতুন কবিদের বা উদ্যোক্তাদের নিরাশ না করে বলব এই লেখাগুলো যত বেশি প্রিন্ট মিডিয়ার আসবে তা অনেক বেশি যোগ্য হয়ে উঠবে।অনেক বেশি কাম্য হয়ে উঠবে এবং অনেকবেশি স্থায়িত্ব পাবে।
২৪.ডায়মন্ড হারবারের বা আপনার জেলার অগ্রজ-অনুজ সব কবিদের লেখালেখির সঙ্গে আপনার কমবেশি নিবিড় সম্পর্ক বা পরিচিতি আছে। সেক্ষেত্রে তাঁদের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর:-এই খানে বিতর্ক থাকলেও বলব ।রফিক উল ইসলাম আমাদের পরে পরে লিখতে এসেছে।ও খুব ভালো লিখত।ওর কবিতায় একধরনের মায়াময় মোহান্ধতা আছে। সেখানেই ওর শব্দবন্ধের জোর। কিন্তু পরবর্তীতে যেকোন কারণে (পারিবারিক বা অন্য কোন ঘটনায় হোক) ও কবিতার উত্তরণ থেকে অনেকটা সরে গেছে। ওর কবিতা যেন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বাঁধা পড়ে আছে। তবে ইদানিং রফিক আবার নতুন উদ্যমে কবিতায় ফিরে এসেছে। এটা অবশ্যই আনন্দের। আবার অন্যদিকে সৌমিত বসুর কবিতার কথা বললে বলতে পারি,তাঁর কবিতার বিস্তার অনেক বেশি।বিস্তার বলতে, তাঁর কবিতার বিষয়, সামাজিকতা, ঘটনাবলি ।সে সময়কে ধরে বিভিন্ন সময়ে এগিয়েছে।সৌমিতও আটের দশকের, রফিকও। সেক্ষেত্রে রফিক ও সৌমিতকে ধরে বলি( আমি কাউকে ছোট করছি না) তুলনামূলকভাবে সৌমিতের বিষয়গত বিস্তার বা ক্যানভাস অনেক বড়।
এরপর আসব তোমার কাছে,অরুণের কাছে বা সাকিল আহমেদের কাছে।সাকিল কবিতা লিখত। কবিতা লিখতে লিখতে ও ছড়ার দিকে এত বেশি মন দিল যে কবিতা থেকে সরে গেল। অবশ্য ছড়ার হাতটা ওর ভালো ছিল বটে, কিন্তু, সংগঠন ও নানা অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় ওর বোধ হয় লেখালেখির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে ঘাটতি হচ্ছে। সেটা আমি সরাসরি ওকে বলেছিলাম।এখন অবশ্য সাকিল আবার ভালো কবিতা আমাদের উপহার দিচ্ছে।
আবার অন্যদিকে, তোমার আর অরুণের কথায় আসি-তোমার কবিতা পড়ে তোমাকে আমি একসময় অনেক কথা বলেছিলাম। তোমার কবিতার মধ্যে একধরনের বিভোরতা আছে, এক ধরনের সামাজিকতা আছে।যা ধারন করে আছে সামাজিক জীবন ও তার মননশীলতা, সাথে সাথে সুদীর্ঘকালের অনুশীলিত কবি সুলভ প্রজ্ঞা তাতে সুন্দরের অভিজ্ঞান রচনা করে। অরুণের কবিতার মধ্যে অন্য এক ধরনের গভীরতা আছে ,যেটা আমার খুব ভালো লাগে।ও শব্দের কারুকাজে আমার কাছে ধরা দেয়। তাই তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের কবি বলে মনে হয় আমার।তাঁর দর্শনে সমাজ সংস্কৃতি সবকিছুরই মিশ্রণ অবশ্যই চোখে পড়বে। সাথেসাথে আরও একটি বিষয় খুব সূক্ষ্ম এবং সুচারুরূপে মিশে থাকে,তাহল আধ্যাত্মিকতার অনবদ্য এক অনাস্বাদিত বিস্তার। অবশ্য,তোমাদের সাধনার ক্ষেত্র আলাদা। সেভাবে দুজনের সাধনা এগিয়ে চলুক এটা আমার ইচ্ছে। তবে, দুজনকে ভাঙচুর করতে হবে। ভাঙচুর করতে হবে এই অর্থে,কবি তো কোন জড় পদার্থ নয়।কবির সামনের জগৎ অনেক বেশি, অনেক বড়। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে ঋদ্ধ করছে, সমৃদ্ধ করছে। তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে।কবি সেগুলো তাঁর লেখায় ধরবেন এটা চাই। আর আমার অনুজ হিসেবে তারা সেই জায়গাটা ধরবেন, এটা তো আমার পক্ষে একটা দারুণ আনন্দের ব্যাপার।সেই জায়গা থেকে কবি তাজিমুর রহমান,কবি অরুণ পাঠককে বলব, তারা তাদের সে জায়গাটা ধরে রাখুক।এর পাশাপাশি কবি অমলেন্দু বিকাশ দাস,কবি অরূপ দত্ত ও দিলীপ প্রামাণিকের কথা বলতে হবে। ইদানিং অরূপ খুব ভালো লিখছে। দিলীপের কবিতাও ভালো।নাগসেন,রিয়াদ হায়দার,শান্তনু প্রধানের কথা এপ্রসঙ্গে বলা যায়।নাগসেন ধারাবাহিকভাবে না লিখলে লেখার হাতটি ভালো।রিয়াদের ছড়ার হাতটি বেশ দক্ষ।শান্তনু প্রধান ও সুনেন্দু পাত্র ভালো লিখছে।
২৫.আপনি আট,নয় বা শূন্যের কথা বললেন।এর পরের প্রজন্মর কথা বলুন?
উত্তর:-আমার চোখে তেমন কেউ পড়ছে না ভাই। এটা তো আমার কাছে খুব দুঃখের কারণ। তবে,সৈকত ঘোষ নামে একটি ছেলে লিখত।ও আমাদের ছাত্র।একটা বইও প্রকাশ করেছিল।ও একটা পত্রিকাও করত।এখন মনে হয় কোন মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আর লেখালেখি করে কিনা জানি না।আর একটা ছেলে চন্দন মিত্র,ওর সঙ্গে আমার আলাপ নেই। অরুণের কাছে জেনেছি ওর সম্পর্কে।ও কবিতা না গল্প লেখে তা বলতে পারব না।এই দুজনের কথা জেনেছি, কবিতা চর্চা করছে। তবে, ওদের চর্চা নিরবচ্ছিন্ন নয়। কবিতা চর্চা বা সাহিত্য চর্চা করতে গেলে যেভাবে নিয়মিত হতে হয় বা সবসময় বসতে হয় বা লিখতে হয়-সেই জায়গাটা বোধ হয় ওদের মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে চোখে পড়ত আমাদের।
২৬.আপনার প্রিয় কবি,লেখক কারা?
উত্তর:-প্রথম তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।তারপর জীবনানন্দ দাশ,শঙ্খ ঘোষ,শক্তি চট্টোপাধ্যায়,জয় গোস্বামী -এরকম।
বিদেশি কবি রিলকে ও আমেরিকার কবি এমিলি ডিকিনসন আমার খুব প্রিয়।
গদ্যের ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথের পরে প্রথম এবং প্রিয় হলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়া বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু।একসময় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ও আমাকে মুগ্ধ করেছেন।
২৭. প্রিয় বই,প্রিয় পোশাক,প্রিয় খাবার?
উত্তর:- কবিতার বই হলে পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ।
গদ্য বললে, কবিতার ক্লাস। তাছাড়া কবিতার মুহূর্ত সহ শঙ্খ ঘোষের সব গদ্যের বই আমার প্রিয়।অলোকরঞ্জন দাশের কয়েকটি প্রবন্ধের বই ও আছে।জয় গোস্বামীর গোঁসাই বাগান আমার প্রিয়। এছাড়া চিন্ময় গুহর 'ঘুমের দরজা ঠেলে 'এবং' আয়না ভাঙতে ভাঙতে' ইত্যাদিও আমার প্রিয়।
২৮. প্রিয় পোশাক? কখনো প্যান্ট শার্ট পরেছেন?
উত্তর:ধুতি ও পাঞ্জাবি আমার প্রিয় পোষাক। একবার কলেজে এন সি সি করার ক্ষেত্রে প্যান্ট শার্ট পরেছিলাম। তাছাড়া একবার প্যান্ট শার্ট করে দিতে বাবাকে বলেছিলাম। বাবা বলেছিলেন, তোর দাদার প্যান্ট শার্ট ছোট হয়ে গেছে, সেটা পর।তবে আমি সাধারণত কলেজে ধুতি পাঞ্জাবি পরতাম।
২৯.প্রিয় খাবার?
উত্তর:ভাত,মাছ, মাংস তো খাই।তবে একটা কথা বলি, আমি নিরামিষ খেতে ভালো বাসতাম। সেক্ষেত্রে,মুগ ভাল, আলুপোস্ত,আর গোল গোল করে আলু ভাজা আমার খুব প্রিয় খাবার।
৩০.বাংলা কবিতার ধারায় কবি দীপক হালদার নিজেকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন।
উত্তর: এ তো বড় কঠিন প্রশ্ন! হা হা হা।আসলে দীপক হালদার কখনো ওই জায়গায় মুল্যায়ন করতে চায় না।দীপক, বিশেষ করে কবি দীপক নিজেকে কবিতার জগতে মিলিয়ে দিতে চেয়েছে। এবং সেই জায়গায় গিয়ে নিজে লিখে লিখে থাকতে চেয়েছে-সে কবিতা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, না, কবিতার মধ্যে থাকতে পারছে।সে জায়গায় যদি থাকতে পেরে থাকেন, তাহলে একসময় তার মূল্যায়ন হবে। নিজের মূল্যায়ন নিজে করা যায় না।পাঠক করবে।সে কবি তাজিমুর করতে পারে। কিংবা কবি অরুণ পাঠক করতে পারে বা কবি রফিক উল ইসলাম করতে পারে। আমি মনে করি,
আমার কাজ লিখে চলা।লেখার মধ্যে নিজেকে হাজির করা। নিজেকে ধরে রাখা। সেটা যদি করতে পারি মূল্যায়ন একদিন না একদিন হবেই।
***
অনেকক্ষন সময় দিয়েছেন দীপকদা। শ্রদ্ধা ও প্রণাম নেবেন।


Comments
Post a Comment