ক বি ম জি দ মা হ মু দ
মজিদ মাহমুদ
জন্ম:-১৬ এপ্রিল, ১৯৬৬,পাবনায়। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। লেখালেখির হাতে খড়ি শিশুবেলা থেকে। কবিতা তাঁর নিজস্ব জগৎ হলেও গবেষণার কাজেও তিনি দক্ষ। নজরুল ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে কাজ করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫০ এর বেশি।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ:- বল উপাখ্যান,আপেল কাহিনী, ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম,মাহফুজামঙ্গল,কাব্য সঞ্চয়ন প্রভৃতি।প্রবন্ধগ্রন্থ:- ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ,কেন কবি কেন কবি নয়, নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র, রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ প্রভৃতি।
দু’টি কবিতায়
মজিদ মাহমুদ
অভিন্ন আত্মার বন্ধু
আমার অভিন্ন বন্ধু ছিল- নাম তার কালাচাঁন
আমরা একই সঙ্গে জন্মেছিলাম একই মায়ের উদরে
যদিও সারাজীবন করেছি তার প্রতি অবজ্ঞা
মেরেছি উপেক্ষার বাণ
জন্মের পর থেকেই আমি তাকে এড়িয়ে চলেছি
যে লোক প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে করে প্রতারণা
সে অন্য কারো ভালো বন্ধু পারে না হতে
আমিও পারিনি
কাউকে অবলম্বন করেছি- প্রয়োজন ক্রমে
দরকার ফুরালে করেছি ত্যাগ
মা-ই ছিল আমার প্রথম সোপান, প্রথম খাদ্য
তিনিও দূর গ্রামে পিতার সঙ্গে থাকতে এসছিলেন
আমার ভাইবোন, পাড়া-পড়শি
সহপাঠি সহকর্মী- সবাই আমার সাময়িক বন্ধু
কর্মের প্রয়োজনে চারপাশে করেছে ভিড়
নেতা ও বস তেলানো
শরীর পরিপুষ্ট হলে অন্য শরীরের হয়েছে প্রয়োজন
নতুন মানুষেরা এসেছে ভেসে প্রবল তোড়ে
কিন্তু তারাই বা আমার কে
তারা কি আমার সঙ্গে ছিল
তারা কি আমার সঙ্গে এসেছিল
তারা কি কেউ আমার সঙ্গে যাবে
মানুষ এ-সবের নাম দিয়েছে মহৎ ভালোবাসা
কেউ বলছে কর্তব্যকর্ম
আমিও ভেবেছি এসব মহান
কিন্তু যে অভিন্ন বন্ধুকে উপেক্ষা করে
সে কি কাউকে ভালোবাসতে পারে!
আমিও বাসিনি- আমার নিঠুর কালা বন্ধুকে
যেহেতু সে বিনয়ী ও জীর্ণ
যেহেতু সে মাটি সংলগ্ন থাকে
বাতাসের সঙ্গে অদৃশ্য
সে জলস্রোত ভেসে বেড়ায়
সে মহামূল্যবান জ্বালানির পরিশ্রুত জীবাশ্ম
শুভ্র কাপড় করে রক্তাক্ত
সুন্দরী-বন্ধুর শরীর পুরো খেয়ে ফেলে
পুত্র ও কন্যাদের করে পরিচয়হীন
সর্বগ্রাসী করে না কারো অধিকার স্বীকার
এই অকৃত্রিম বন্ধুকে আমি করেছি অবহেলা
তার মৃত্যু হলেও আমি বেঁচে থাকতে চেয়েছি
দেখেছি স্বর্গের স্বপ্ন, চিরস্থায়ী নাম ও যশ
তবু সে অভিযোগহীন
উপেক্ষিত বন্ধুর মতো নীরব অপেক্ষায় থেকেছে একা
যখন একে একে সবাই দূরে চলে যাচ্ছে
তখন সে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে
কেননা সে আমায় একা হতে দিতে চায় না
সে আমায় রেখেছে বেঁধে বেঁধে
তাকে যদি দিতাম কিছুটা সময়
রাখতাম স্মরণ
তাহলে হতে হতো না এতটা অকৃতজ্ঞ
মায়ের প্রতি, পিতা ও ভাইবোনের প্রতি
বন্ধু ও প্রেমিকাদের প্রতি
যারা দিয়েছিল ক্ষুধায় অন্ন
কামনায় শরীর
তাদের এভাবে করতাম না অবজ্ঞা
আজ যদিও নেই সে-সব পরিশোধের সময়
তবু অভিন্ন আত্মার বন্ধুর দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছি হাত
স্মিত হেসে বলছি, ভুলিনি দোস্ত তোকে
মাঝে মাঝে তুইও তো মারতে পারিস চাবুক
এখনো যখন লিপ্সা ও লোভে
কামনা ও মায়ায় লেপ্টে থাকি
তখন তুই এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাস
সেই লেংটাকালে ধূলোয় লুটোপুটি খেলতে
তার মানে এই নয়
তুই সবটা করবি দখল
আমার তো এখন ঋণ পরিশোধের কাল
এতদিন নিয়েছি যা অকাতরে
বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা
তার সবটা রেখে যেতে হবে শিশুদের খেলার মাঠে
যারা তুচ্ছ হারিয়ে ফেলবে সন্ধ্যায়
কারণ তোর সঙ্গে চলে যাওয়ার সময়ে
এক চিলতে সুতাও সঙ্গে নিব না।
রাতের ফোন
রাত থাকতে এক কবির ফোন
কেমন আছেন ভাই
প্রায়শ এমন ঘটে-
ভাবি তাই বলে এত রাতে
বুঝলাম ঠিক খারাপ কিছু হবে
বলল রাতে আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি
ভয় কেটে গেল
ফাঁড়াটা অন্তত আমার ওপর দিয়ে গেল
যারা ঘুমের মধ্যে আমারে পায়
তারা দেখে শাদা কাপড় মোড়ানো দেহ
চকলেটের মতো দুই দিকে মারা গিট
তবু জানতে ইচ্ছে করে
তার স্বপ্নে কিভাবে মরেছি আমি
দিনের আলোয় কেউ কি মেরেছে ভুজালি
নাকি রাতে- গলির মুখে অন্ধকারে
যদিও জানি স্বপ্নের আছে অন্য মানে
হয়তো কাল দিনে চায়ের দোকানে
কনকর্ড কিংবা ক্যাফেতে
আমার অনুপস্থিত ছায়া-শরীর ঘিরে
কেউ মেরেছিল কথার ছুরি
তার তাজা রক্তের দাগ
লেগে আছে তরুণ কবি বন্ধুটির মনে
যেহেতু সেও অসহায়
গোন্ডাদের ভয়ে পারেনি নিতে
হাসপাতালের করিডোরে
তার অবচেতন মনে নির্ঘাত মরেছি
ফ্রয়েড বা ইয়ুং-এর মত কাছকিাছি
যদিও শৈশবে শুনেছি মায়ের কাছে
মৃত্যু দেখলে বাড়ে আয়ু
কমে ঘাতকের পরমায়ু
বলি- এখনো বেঁচে আছি হে বুদ্ধিমান
পৃথিবীতে মৃত্যু নয় জীবনের সমান।


Comments
Post a Comment