স ম্পা দ কে র জা না লা
অরুণ পাঠক
এই শতাব্দীর সূচনালগ্নের কবি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বারোটি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রশস্তির ভিন্ন রূপ' ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত শেষ কাব্যগ্রন্থ ' হাসি হাসি কান্নার বরফ' প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে কলকাতা বইমেলায়। সম্পাদিত পত্রিকা : সাহিত্যের বেলাভূমি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ স্নাতকোত্তর ও শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রীপ্রাপ্ত।পেশা : শিক্ষকতা। কবিতা লেখা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত।
এ সংখ্যার 'সম্পাদকের জানালা-র জন্য মনোনীত হয়েছেন'সাহিত্যের বেলাভূমি' পত্রিকার সম্পাদক কবি-সম্পাদক অরুণ পাঠক ।
নিজেকে সমৃদ্ধ করতে প্রত্যেক কবি-লেখকেরই পত্রিকা সম্পাদনা করা উচিত
দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই কবিতা লেখার দেবতা আমার মাথায় ভর করেছিলেন। আর প্রায় একই সময় থেকে কবিতা প্রকাশের জন্য একটি লিটল ম্যাগাজিনের চিন্তাও আমাকে পাগল করে তুলেছিল। তখন আমার পরিবার ছিল দারিদ্র সীমার নীচে। এই আর্থিক অবস্থা বহাল ছিল আমার পরিবারে আমি চাকরি পাওয়ার আগে পর্যন্ত। যাইহোক ১৯৯৫ সালের বসন্তে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হল এবং শেষ হতে হতে গ্রীষ্ম তার মৌনীমুখের জটাভারে এবং উদাস সংকেতে আমাকে তপ্ত করে তুলল পত্রিকার জন্য। ক্লাসে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট এবং ভদ্র মানসিকতার জন্য সবাই আমার বন্ধু ছিল। ক্লাসের বাইরেও আমার বন্ধু ছিল দু-একজন। তাদেরই মধ্যে একজন পুলক মন্ডল। সম্পন্ন বাড়ির ছেলে। আমাকে ভালোও বাসতো খুব। একদিন তাকে কথাটা পাড়লাম। বোঝালাম এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে আমাদের পাঁচজন মানুষ চেনে, জানে। সে জিজ্ঞেস করল, 'কী করতে হবে?'
আমি বললাম, 'আপাতত একটি পত্রিকা। যা খরচ হবে তার অর্ধেক টাকা তোকে দিতে হবে।'
সে রাজি হল। এবং অন্যান্য বন্ধুদের সহযোগিতায় বৈশাখের একেবারে শেষ দিকে আমাদের গাঁয়ে-গঞ্জে কৃষ্ণচূড়া যখন আকাশে আগুন ছড়িয়ে ফুটে আছে সেরকম একদিন প্রকাশিত হল 'বেলাভূমি'।
এই প্রসঙ্গে বলি আমার বন্ধুদের মধ্যে সে সময় সুমিত মোদক, শ্যামল হালদার, অশোক কুমার হালদার প্রমুখরা ছিল।সেইসঙ্গে ছিল অগ্রজ কবি ভীম ঘোষ। সম্পাদক এবং কবি হিসেবে আমার না-বালক সত্তাকে ভীমদা চিনেছিল ও স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন লেটার প্রেস। কবিতা ছড়া প্রবন্ধ গল্প সব মিলিয়ে পত্রিকার লেখক মুলত আমরাই। সেই যে শুরু হল ছ'মাস অন্তর পত্রিকা প্রকাশের দায় চেপে গেল আমার কাঁধে। যেহেতু আমিই ছিলাম সম্পাদক। ক্রমশ বন্ধুদের আর্থিক সহযোগিতা কমে যেতে থাকল। কিন্তু আমিও নাছোড়।এদিকে কলেজে ভর্তি হয়েছি ততদিনে। বাংলা অনার্স। সাহিত্য চর্চা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য আমার বন্ধুবৃত্ত ও পরিচিতি বাড়তে থাকল। যদিও পত্রিকার মান এ সময় তেমন কিছু ছিল না। গ্রাম্যতা কাটিয়ে উঠতে আমার কিছুটা সময় লেগেছে। ততদিনে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে মতের অমিল হওয়ায় সুমিত মোদক পত্রিকা থেকে সরে যায়। আরও কেউ কেউ এমনিই সরে গেছে। যদিও সে সময় আমার নিজের অর্থ এক পয়সা ছিল না। সবটাই সাহায্য বা ভিক্ষার ওপর নির্ভর করতো। ১৯৯৮ সালে আমি অনার্স পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এই সময় আমি বুঝতে পারি বর্তমান সময়ে কোন ধরনের লেখালেখি হচ্ছে বা প্রকৃত লেখক কারা। কলেজ লাইফে আমার সহপাঠী কোনও বন্ধুকে কবি হিসেবে পাইনি। সিনিয়র হিসেবে পেয়েছিলাম চন্দন মিত্র, নিরাশাহরণ নস্কর, অরূপ কুমার নস্কর-দের। বিশ্ববিদ্যালয়ে পেয়ে গেলাম সহপাঠী হিসেবে কবি সুদীপ্ত মাজি-কে। সুদীপ্ত ততদিনেই কবি হিসেবে সারস্বত সমাজে স্বীকৃত। আর আমিতো শুরুই করিনি।এতদিন যা চেষ্টা করেছি সব জলাঞ্জলি দিয়ে নিজে নতুন করে জন্মালাম যেন। সহ সম্পাদক বন্ধু শ্যামলকে নিয়ে একদিন সকালে বের হলাম ডায়মন্ড হারবারের উদ্দেশ্যে। কবি সুপ্রকাশ ঘোষ, কবি সুধীর দত্ত,কবি দীপক হালদার ও কবি রফিক উল ইসলামের বাড়ি গিয়ে তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হলাম ও কবিতা নিলাম। কবিতা দিল সুদীপ্ত মাজিও। সম্পাদক হিসেবে নবজন্ম হল আমার।
ধীরে ধীরে ছাপাখানার প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হচ্ছে। ডি টি পি বলে একটি মুণ্ডমাল শব্দ ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে। ইতিমধ্যেই কবি রফিক উল ইসলামের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছে।পরিচিত হয়ে উঠেছি কবি অমিতাভ গুপ্তের সঙ্গেও।সেই সঙ্গে সন্ধান মিলল ডায়মন্ড হারবারের একটি ডি টি পি সেন্টারের।বুদ্ধদেব বসু-কে স্মরণ করে নতুন পদ্ধতিতে ছাপা হল বেলাভূমি।এখন থেকে পত্রিকা হয়ে উঠল শুধু কবিতা ও কবিতা বিষয়ক। প্রকৃত কবিতা লেখার শুরুও এখন থেকেই।সালটা ২০০০। নতুন উদ্যমে ও দিশায় জীবন শুরু হল।পত্রিকা আর জীবন এক হয়ে গেল। তবে আর্থিক সঙ্গতি এত কম ছিল যে পত্রিকাকে কখনও পৃষ্ঠাসংখ্যার অনুপাতে বড় করতে পারিনি। কম পৃষ্ঠাতেই চেষ্টা করেছি পত্রিকার উচ্চমান বজায় রাখার। সব সময়েই প্রাধান্য দিয়েছি প্রচলিতের বাইরে যারা লেখালেখি করেন তাদের গুরুত্ব দিতে। তবে হঠাৎই লেখা কোনও কবিযশোপ্রার্থীর কাঁচা লেখা ছাপতে পারিনি বলে অনেকেই গোঁসা করেছেন। যদিও তাদের কেউ-ই নিজেকে উন্নত ও আপডেট করার কথা চিন্তা করেনি। একজন কবির সাধনা সারা জীবনের। আর আমার বিখ্যাত হওয়ার কোনও তাড়া নেই।এই সংযম ও ধৈর্য না থাকলে কেউ বাংলা ভাষার কবি হতে এসো না। এই চরম সত্যটি প্রথমেই উপলব্ধি করতে হয়। তা হলে অনেক দুঃখ-অপমান-বঞ্চনা অক্লেশে হজম করা যায়। তবে ওই দুই বা তিন ফর্মার পত্রিকা হাতে নিয়ে অনেকেই আমাকে বলেছেন যে তারাও চেষ্টা করেন অনুরূপ একটি পত্রিকা করার। কিন্তু ঠিক এইরূপ পারেন না। তখন আমি আমার দুটো হাতের দিকে তাকাই। এখানে একটু আগের কথা বলি।একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় যখন নিজের লেখা কবিতাকে কিছুতেই আধুনিক করে তুলতে পারছিলাম না তখন হঠাৎই মনে পড়ে গেল বছর খানেক আগে একদিন কবিতার খাতা হাতে এক বন্ধুর বাড়িতে আগত কবি ভীম ঘোষের কথা। তখন কবিতা না লিখলেও তিনি আমার সঙ্গে কথা বলে খুব আনন্দ পেয়েছিলেন।ভীমদার বাড়ির কাছাকাছি এক সহপাঠী মারফত খবর পাঠাই। আর তিনি একদিন উড়তে উড়তে আমাদের বাড়ি এসে উপস্থিত হন।সেদিন তাঁকে দেখে আমার দেবদূত মনে হয়েছিল। বলেছিলাম,'তুমি তো আধুনিক কবিতা লেখো। আমাকে আধুনিক কবিতার বই দু-একটা দেবে। তাছাড়া ওই ধরনের পত্র-পত্রিকা।' ভীমদা খুব আনন্দের সঙ্গে ফিরে গিয়ে আবার যেদিন এল, সেদিন তার হাতে দুটি কাব্যগ্রন্থ আর দুটি কৃশকায় পত্রিকা। কাব্যগ্রন্থ দুটি কবি জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' আর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব' আর পত্রিকা দুটির একটি 'জাগরী' (সম্পাদক : অপূর্ব কুমার সাহা) এবং অন্যটি ' শমী' ( সম্পাদক : স্বপন শর্মা)। এই দুটি পত্রিকা পরবর্তী পনের বছর আমার সঙ্গী ছিল। আমার পত্রিকার গঠন ও বিষয় বিন্যাসে এই পত্রিকা দুটির প্রভাব আছে। ওদের নিয়েই আমি আমার নিজের পত্রিকার স্বপ্ন দেখতাম। পরবর্তীতে আমার পত্রিকার নিজস্ব রুচি তৈরীতে কবি রফিক উল ইসলামেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সম্পাদনার ব্যাপারে সুস্থ রুচির শিক্ষা আমি ওনার কাছ থেকেই পাই। যাইহোক ২০০০ সাল পরবর্তীকালে বেলাভূমির বেশিরভাগ লেখক ছিলেন শূন্য দশকের। সেইসঙ্গে দুই বাংলার প্রথিতযশা কবিদের নিয়ে গদ্য গ্রন্থসমালোচনা সাক্ষাৎকার অনুবাদ কবিতা
সবই প্রকাশিত হতে থাকে। ২০১২ সালে বেলাভূমি রেজিস্ট্রেশন নাম্বার পায় ও তার নাম হয় সাহিত্যের বেলাভূমি। এক বছর পর পায় আই এস এস এন নাম্বারও। ততদিনে বাড়িতে নিজেই একটি ডি টি পি ইউনিট তৈরি করেছি। ফলে পত্রিকার সাজ ও সৌন্দর্য আরও নিখুঁত হতে থাকল। ২০২০ সালে সদ্য প্রকাশিত সংখ্যা যখন হাতে এল তার দুদিন পর থেকেই শুরু হল লকডাউন। ভাবতে বসি পত্রিকার ভবিষ্যৎ কী হবে। আগস্ট ২০২০ থেকে সাহিত্যের বেলাভূমি ব্লগজিন প্রকাশিত হল। এবার মাসে মাসে। সেই প্রকাশের ধারা এখনও অব্যাহত। এখন আবার ভাবছি প্রিন্ট সংখ্যা করার।
কিছু সাধারণ কথা:
সাহিত্যের বেলাভূমি আকারে প্রকারে সত্যিই একটি লিটল ম্যাগাজিন।
প্রথম প্রথম বিজ্ঞাপন সামান্য পেলেও এখন সে চেষ্টাও করা হয় না।
বন্ধুবৃত্ত থেকে সাহায্য বা ভিক্ষাও আসে না তেমন।
একটা সময়ের পর থেকে পত্রিকা একান্তভাবেই সম্পাদক নির্ভর।
পত্রিকা সম্পাদক এখনও তাকে সদ্যোজাত সন্তানের মতোই দেখে। নিজের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের থেকে পত্রিকা প্রকাশকে জরুরী মনে করে।
আমাদের পত্রিকার বিপনন তেমন নেই।পত্রিকা বিক্রির ঠেকগুলি প্রায়শই আমাদের বিক্রয়জাত অর্থ থেকে বঞ্চিত করতে পছন্দ করে।
আমরা তাই পত্রিকা সজ্ঞানে সৎপাত্রে বিলোতে পছন্দ করি। লেখকদের তো বটেই।
প্রাপ্তি
বিজ্ঞাপনের জন্য একাধিক জায়গায় নিন্দা-মন্দ শোনা।
অনেক সময় মূল্য প্রত্যাশা করে পত্রিকা দেওয়ার পর শুধু একবার হাসির বিনিময়ে পত্রিকাটি ঝোলাধকরণ করা।
মুক্তিপথ দিশারী সংস্থা ( দক্ষিণ শালিগড়িয়া, যুগদিয়া, মগরাহাট, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ) কর্তৃক প্রাপ্ত পুরস্কার ২০১৪।
সুচেতনা রজতজয়ন্তী সম্মাননা ২০২১ প্রাপ্তি
পত্রিকা সম্পাদনা করে এতদিনে অনেকের বিরাগভাজনও হয়েছি। ৩২ বা ৪৮ পৃষ্ঠার একটি কাগজে একটা পৃথিবীকে স্থান দেওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব নয় আদর্শের পরিপন্থী কোনও লেখাকে স্থান দেওয়া। কবিতা হয়ে ওঠেনি এরকম কোনও নির্মাণকেও স্থান দেওয়া। আমি মনে করি প্রত্যেক পত্রিকার ছোট হলেও একটা নিজস্ব লেখকগোষ্ঠী থাকা দরকার। দীর্ঘসময় চলা পত্রিকার লেখক গোষ্ঠী পরিবর্তিত হয়।বেলাভূমির ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। যদিও তার লেখকেরা আসমুদ্র- হিমাচলবাসী।কাকদ্বীপ থেকে কুচবিহার উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ সমানভাবে স্থান পেয়েছে বেলাভূমির পাতায়। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় বাংলাদেশের কবিতা কবিতা বিষয়ক আলোচনা পুস্তক আলোচনা সবই প্রকাশিত হয়েছে এযাবৎ। পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে শিখেছিও অনেক। আমার মনে হয় প্রত্যেক কবি-লেখকেরই পত্রিকা সম্পাদনা করা উচিত। তাতে লেখক জীবন সমৃদ্ধ হয়। সাহিত্যচর্চা একটা সামাজিক কাজ। অপরের লেখাকে লালন করতে শিখতে হয়। আমি অবশ্য সম্পাদনা ব্যবসার কথা বলছি না। যদিও সম্পাদনা করে কেউ যদি নিজের ভাত জোগাড় করতে পারে তাতে আমি আনন্দিতই হব। আমি শূন্য হাতে পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেছিলাম।এখনও আমার হাত শূন্যই আছে। তবে অভিজ্ঞতা, আনন্দ, আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাসে আমার হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। আর কী চাই?
অরুণ পাঠক ।। সোনাকোপা ।। বেলসিংহা ।। ফলতা ।। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ।। ৭৪৩৫০৪ ।।কথা-- ৯৭৩৩৯৬৯৮৮



Comments
Post a Comment